ঢাকা , রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বন্দোবস্ত বনাম ভবিষ্যৎ: জুলাই অভ্যুত্থান

অন্তর্বর্তী সরকার ও নতুন রাষ্ট্রচিন্তার এক বছর

  • — মুনতাসির রাসেল
  • আপডেট সময় ০১:৫০:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ২৭৫ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়—এটি এক দীর্ঘকাল ধরে জমে ওঠা রাষ্ট্রীয় জুলুম, দলীয় কর্তৃত্ব, বিচারহীনতা এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক সামাজিক বিস্ফোরণ। আওয়ামী ফ্যাসীবাদী শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ ‘আওয়ামীতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেছিল, যার মাধ্যমে প্রশাসন, আইন, বিচার, নির্বাচন, এমনকি শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একদলীয় কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ও রাষ্ট্রচর্চা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে জনগণের সেবা থেকে বিচ্যুত করে ক্ষমতাকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় রূপান্তর করে।

এই বন্দোবস্তের অনিবার্য ফল ছিল—দুর্নীতির মহামারী, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার, প্রশাসনিক নির্লজ্জ পক্ষপাত, বিরোধীদলের দমন-পীড়ন এবং নাগরিক অধিকার হরণের সংস্কৃতি। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এই অবিচার, বৈষম্য ও দলনির্ভর রাজনীতির শিকার একটি পুরো প্রজন্ম—বিশেষত তরুণ সমাজ—অবশেষে রাষ্ট্রের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। সর্বোপরি, দেশজুড়ে এক নীরব অথচ গভীর বঞ্চনা জমা হচ্ছিল, যার বিস্ফোরণ ঘটে জুলাই অভ্যুত্থানে। এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রের কাঠামোগত বৈধতার প্রশ্ন তোলে এবং পুরো জাতি এক বাক্যে ঘোষণা করে: এই পুরোনো ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্তে এই রাষ্ট্র আর চলবে না।

এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল হলো নেতৃত্বের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন। যেখানে পূর্বতন রাজনীতি পরিচালিত হতো ক্ষমতা, বংশ, পেশিশক্তি ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, সেখানে অভ্যুত্থানের রাজপথে উঠে এসেছে এক নতুন প্রজন্ম—তারা মূলত ছাত্র, তরুণ পেশাজীবী, স্থানীয় সামাজিক সংগঠক, সাংবাদিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সংগঠক। এই নেতৃত্ব কোনো দলীয় দীক্ষায় গড়ে ওঠেনি, বরং জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা, বঞ্চনার তীব্র উপলব্ধি এবং রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে গভীর প্রশ্নমুখর চেতনার ভেতর থেকে উত্থিত হয়েছে।

তাদের রাজনীতি ক্ষমতার খেলা নয়, বরং কাঠামোর প্রশ্নকে প্রাধান্য দেয়; নির্বাচনী কৌশল নয়, রাষ্ট্রচুক্তির রূপান্তর তাদের লক্ষ্য। তারা মূলধারার রাজনীতির প্রতীকী আচার-অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার খেলায় নেই বরং রাষ্ট্রকে জনগণের মালিকানায় ফেরত আনার লক্ষ্যে নিয়োজিত। তাদের ভাষা স্লোগাননির্ভর নয়, বরং তথ্য, যুক্তি ও অধিকারভিত্তিক। তারা ‘শুধু নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারই মূল প্রশ্ন’—এই অবস্থান তুলে ধরে রাজনীতিকে ক্ষমতার চর্চা থেকে ন্যায় ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পুনর্গঠনের দাবি উত্থাপন করেছে।

এই প্রজন্মের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে এক বিকল্প ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—যেখানে প্রতিরোধ নয়, রূপান্তর; প্রতিহিংসা নয়, পুনর্গঠনই হবে রাজনীতির মূল ভাষা। এই ধারাটিই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নতুন একটি ভিত্তি রচনা করে দেয়।
এই পটভূমিতেই গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার—একটি ঐতিহাসিক আপোষমূলক সমাধান, যার নেতৃত্বে আসেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই সরকার প্রতিষ্ঠার অর্থ ছিল—রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোতে একটি অন্তর্বর্তী ব্যতিক্রম, যেখানে পুরোনো দলীয় শাসনের বাইরে থেকে নতুন শাসনচর্চার সূচনা হবে।

জনগণ একে দেখেছে ‘আস্থার সেতু’ হিসেবে—একটি রূপান্তরকালীন সুযোগ, যাতে দলীয় ক্ষমতার বলয় ভেঙে একটি অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
ড. ইউনূস তাঁর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং সামাজিক পুঁজিকে ব্যবহার করে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, যা স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামীতন্ত্র থেকে জনগণকে সাময়িক মুক্তি দেয়। কিন্তু এক বছর পর এসে প্রশ্ন উঠেছে—এই সরকার কি সত্যিই পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন কাঠামো গড়ছে, নাকি কেবল আগের ব্যবস্থারই সংস্কারমূলক সংস্করণ তৈরি করছে?

জনগণের চাওয়া ছিল কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস; অথচ এই সরকারের নীতিনির্ধারণে বহুক্ষেত্রে সেই তাগিদ অনুপস্থিত। সংবিধান সংস্কার সভা অথবা গণপরিষদ গঠন, নাগরিক সংলাপের ধারাবাহিকতা, রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক সংস্কার—এসব প্রশ্নে সরকার দ্ব্যর্থ ও দ্বিধাগ্রস্ত। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো প্রশাসনিক জড়তা, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য অন্তর্বর্তী সরকারের রূপান্তরমুখী অভিযাত্রাকে টেনে এনেছে দ্বন্দ্ব ও দোলাচলে। ফলে একদিকে গড়ে উঠেছে কৃতজ্ঞতার আবহ, অন্যদিকে জন্ম নিয়েছে সন্দেহ ও সংশয়ের পরত।

এই সন্দেহ নিরসনের প্রধান শর্ত হলো সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোর গভীর সংস্কার। বর্তমান সংবিধান এককেন্দ্রিক, দলনির্ভর এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার পাটাতন। এটি রাষ্ট্রপতিকে করে কার্যত দলীয় সরকারের মদদপুষ্ট, সংসদকে পরিণত করে গৃহপালিত সংখ্যাগরিষ্ঠতায়, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে বানায় নিয়ন্ত্রিত ও পক্ষপাতদুষ্ট কাঠামোতে। এই বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে বারবার সংশোধনের মোড়ক ব্যবহার করা হলেও কাঠামোগত বদল ঘটেনি।

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ একটিই—একটি নতুন রাষ্ট্রচুক্তির ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক ও জণগনের অংশগ্রহনের ভিত্তিতে বিদ্যমান সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার । এই রূপান্তরের মূল উপাদান হতে হবে: বিচারব্যবস্থার সাংবিধানিক স্বাধীনতা, নির্বাহী বিভাগ ও আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, তথ্য অধিকার ও নাগরিক পরামর্শের সংবিধানিক রূপ যা গণপরিষদ ও গণভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করবে।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো পুনর্বিন্যাস, যেখানে বাজেট হবে জনগণের পরামর্শভিত্তিক এবং ব্যয় হবে স্বচ্ছ ও ন্যায়ের প্রতি প্রতিশ্রুত। বর্তমানে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় কার্যত অনুপস্থিত। তাই এই ব্যবস্থা কেবল সংস্কার নয়, মৌলিকভাবে বিলোপ দাবি করে।
এই লক্ষ্যে প্রয়োজন একটি যুগান্তকারী ব্যবস্থা—একযোগে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার সভার নির্বাচন আয়োজন। এতে অন্তর্বর্তী সরকার থাকবে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি গণপরিষদ প্রণয়ন করবে একটি বৈধ, সময়োপযোগী ও অংশগ্রহণমূলক সংবিধান।

এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি নাগরিক একজন প্রার্থীকে দ্বৈত ভূমিকায় নির্বাচিত করবেন—একই ব্যক্তি হবেন জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার সভার প্রতিনিধি। প্রথমে গণপরিষদ হিসেবে তারা কাজ করবেন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের খসড়া ও জুলাই ঘোষণার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংস্কারপ্রস্তাব তৈরি করবেন, যা গণভোটে উপস্থাপিত হবে। এতে অনুমোদন পাওয়া গেলে সেই ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হবে। এই ত্রিস্তরীয় প্রক্রিয়ায়—গণপরিষদের বৈধতা, গণভোটের সর্বোচ্চ ম্যান্ডেট এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর—গড়ে উঠবে এক নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামো।
এই কাঠামো নির্মাণে আরেকটি শর্ত হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন।

গণতন্ত্র কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে নয়, বিকশিত হয় স্থানীয় স্তরে সক্রিয়, স্বায়ত্তশাসিত ও জনগণের সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের অগ্রাধিকার দিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে পড়ে। অথচ ২০০৮ সালের মতো একটি উদাহরণই বলে দেয়—তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এই নির্বাচন একদিকে যেমন স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশ ঘটায়, তেমনি নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ দেয়। প্রশাসনিক কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণ, গণতান্ত্রিক অনুশীলন এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরিতে এটি একটি অনিবার্য ধাপ।

সবশেষে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি পুরোনো আওয়ামীতন্ত্র, লুটপাটতন্ত্র ও জুলুমতন্ত্রে ফিরে যাব, নাকি একটি নতুন রাষ্ট্রচুক্তির মাধ্যমে গড়ে তুলবো অংশগ্রহণমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণের মালিকানাধীন একটি রাষ্ট্র?
সময়ের দাবি এখন স্পষ্ট—সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার, অন্তর্বর্তী সরকারের সাহসী পদক্ষেপ এবং সংবিধান সংস্কার সভা, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সমন্বিত আয়োজন। এ সংবিধান হবে জনগণের সর্বস্তরের অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক সংলাপের মাধ্যমে রচিত, যা প্রতিষ্ঠা করবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা।

রাষ্ট্র যদি জনগণের ভাষা না বোঝে, তবে জনগণের রক্তই সংবিধানের ব্যাকরণ হয়ে ওঠে। তাই জাতির হাতে এখন কলম, সামনে সাদা পৃষ্ঠা। এই মুহূর্তেই সময় নতুন অভিলেখ লেখার, যেখানে থাকবে ঐতিহ্যের শিকড় ও মুক্তির উন্মেষ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি নিজের রাষ্ট্র নিজ হাতে পুনর্গঠন করে, তার স্বাধীনতা আর কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না।

মুনতাসির রাসেল

লেখক, সংগঠক।

আর

জনপ্রিয় সংবাদ

বন্দোবস্ত বনাম ভবিষ্যৎ: জুলাই অভ্যুত্থান

অন্তর্বর্তী সরকার ও নতুন রাষ্ট্রচিন্তার এক বছর

আপডেট সময় ০১:৫০:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়—এটি এক দীর্ঘকাল ধরে জমে ওঠা রাষ্ট্রীয় জুলুম, দলীয় কর্তৃত্ব, বিচারহীনতা এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক সামাজিক বিস্ফোরণ। আওয়ামী ফ্যাসীবাদী শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ ‘আওয়ামীতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেছিল, যার মাধ্যমে প্রশাসন, আইন, বিচার, নির্বাচন, এমনকি শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একদলীয় কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ও রাষ্ট্রচর্চা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে জনগণের সেবা থেকে বিচ্যুত করে ক্ষমতাকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় রূপান্তর করে।

এই বন্দোবস্তের অনিবার্য ফল ছিল—দুর্নীতির মহামারী, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার, প্রশাসনিক নির্লজ্জ পক্ষপাত, বিরোধীদলের দমন-পীড়ন এবং নাগরিক অধিকার হরণের সংস্কৃতি। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এই অবিচার, বৈষম্য ও দলনির্ভর রাজনীতির শিকার একটি পুরো প্রজন্ম—বিশেষত তরুণ সমাজ—অবশেষে রাষ্ট্রের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। সর্বোপরি, দেশজুড়ে এক নীরব অথচ গভীর বঞ্চনা জমা হচ্ছিল, যার বিস্ফোরণ ঘটে জুলাই অভ্যুত্থানে। এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রের কাঠামোগত বৈধতার প্রশ্ন তোলে এবং পুরো জাতি এক বাক্যে ঘোষণা করে: এই পুরোনো ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্তে এই রাষ্ট্র আর চলবে না।

এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল হলো নেতৃত্বের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন। যেখানে পূর্বতন রাজনীতি পরিচালিত হতো ক্ষমতা, বংশ, পেশিশক্তি ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, সেখানে অভ্যুত্থানের রাজপথে উঠে এসেছে এক নতুন প্রজন্ম—তারা মূলত ছাত্র, তরুণ পেশাজীবী, স্থানীয় সামাজিক সংগঠক, সাংবাদিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সংগঠক। এই নেতৃত্ব কোনো দলীয় দীক্ষায় গড়ে ওঠেনি, বরং জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা, বঞ্চনার তীব্র উপলব্ধি এবং রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে গভীর প্রশ্নমুখর চেতনার ভেতর থেকে উত্থিত হয়েছে।

তাদের রাজনীতি ক্ষমতার খেলা নয়, বরং কাঠামোর প্রশ্নকে প্রাধান্য দেয়; নির্বাচনী কৌশল নয়, রাষ্ট্রচুক্তির রূপান্তর তাদের লক্ষ্য। তারা মূলধারার রাজনীতির প্রতীকী আচার-অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার খেলায় নেই বরং রাষ্ট্রকে জনগণের মালিকানায় ফেরত আনার লক্ষ্যে নিয়োজিত। তাদের ভাষা স্লোগাননির্ভর নয়, বরং তথ্য, যুক্তি ও অধিকারভিত্তিক। তারা ‘শুধু নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারই মূল প্রশ্ন’—এই অবস্থান তুলে ধরে রাজনীতিকে ক্ষমতার চর্চা থেকে ন্যায় ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পুনর্গঠনের দাবি উত্থাপন করেছে।

এই প্রজন্মের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে এক বিকল্প ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—যেখানে প্রতিরোধ নয়, রূপান্তর; প্রতিহিংসা নয়, পুনর্গঠনই হবে রাজনীতির মূল ভাষা। এই ধারাটিই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নতুন একটি ভিত্তি রচনা করে দেয়।
এই পটভূমিতেই গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার—একটি ঐতিহাসিক আপোষমূলক সমাধান, যার নেতৃত্বে আসেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই সরকার প্রতিষ্ঠার অর্থ ছিল—রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোতে একটি অন্তর্বর্তী ব্যতিক্রম, যেখানে পুরোনো দলীয় শাসনের বাইরে থেকে নতুন শাসনচর্চার সূচনা হবে।

জনগণ একে দেখেছে ‘আস্থার সেতু’ হিসেবে—একটি রূপান্তরকালীন সুযোগ, যাতে দলীয় ক্ষমতার বলয় ভেঙে একটি অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
ড. ইউনূস তাঁর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং সামাজিক পুঁজিকে ব্যবহার করে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, যা স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামীতন্ত্র থেকে জনগণকে সাময়িক মুক্তি দেয়। কিন্তু এক বছর পর এসে প্রশ্ন উঠেছে—এই সরকার কি সত্যিই পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন কাঠামো গড়ছে, নাকি কেবল আগের ব্যবস্থারই সংস্কারমূলক সংস্করণ তৈরি করছে?

জনগণের চাওয়া ছিল কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস; অথচ এই সরকারের নীতিনির্ধারণে বহুক্ষেত্রে সেই তাগিদ অনুপস্থিত। সংবিধান সংস্কার সভা অথবা গণপরিষদ গঠন, নাগরিক সংলাপের ধারাবাহিকতা, রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক সংস্কার—এসব প্রশ্নে সরকার দ্ব্যর্থ ও দ্বিধাগ্রস্ত। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো প্রশাসনিক জড়তা, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য অন্তর্বর্তী সরকারের রূপান্তরমুখী অভিযাত্রাকে টেনে এনেছে দ্বন্দ্ব ও দোলাচলে। ফলে একদিকে গড়ে উঠেছে কৃতজ্ঞতার আবহ, অন্যদিকে জন্ম নিয়েছে সন্দেহ ও সংশয়ের পরত।

এই সন্দেহ নিরসনের প্রধান শর্ত হলো সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোর গভীর সংস্কার। বর্তমান সংবিধান এককেন্দ্রিক, দলনির্ভর এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার পাটাতন। এটি রাষ্ট্রপতিকে করে কার্যত দলীয় সরকারের মদদপুষ্ট, সংসদকে পরিণত করে গৃহপালিত সংখ্যাগরিষ্ঠতায়, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে বানায় নিয়ন্ত্রিত ও পক্ষপাতদুষ্ট কাঠামোতে। এই বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে বারবার সংশোধনের মোড়ক ব্যবহার করা হলেও কাঠামোগত বদল ঘটেনি।

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ একটিই—একটি নতুন রাষ্ট্রচুক্তির ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক ও জণগনের অংশগ্রহনের ভিত্তিতে বিদ্যমান সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার । এই রূপান্তরের মূল উপাদান হতে হবে: বিচারব্যবস্থার সাংবিধানিক স্বাধীনতা, নির্বাহী বিভাগ ও আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, তথ্য অধিকার ও নাগরিক পরামর্শের সংবিধানিক রূপ যা গণপরিষদ ও গণভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করবে।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো পুনর্বিন্যাস, যেখানে বাজেট হবে জনগণের পরামর্শভিত্তিক এবং ব্যয় হবে স্বচ্ছ ও ন্যায়ের প্রতি প্রতিশ্রুত। বর্তমানে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় কার্যত অনুপস্থিত। তাই এই ব্যবস্থা কেবল সংস্কার নয়, মৌলিকভাবে বিলোপ দাবি করে।
এই লক্ষ্যে প্রয়োজন একটি যুগান্তকারী ব্যবস্থা—একযোগে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার সভার নির্বাচন আয়োজন। এতে অন্তর্বর্তী সরকার থাকবে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি গণপরিষদ প্রণয়ন করবে একটি বৈধ, সময়োপযোগী ও অংশগ্রহণমূলক সংবিধান।

এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি নাগরিক একজন প্রার্থীকে দ্বৈত ভূমিকায় নির্বাচিত করবেন—একই ব্যক্তি হবেন জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার সভার প্রতিনিধি। প্রথমে গণপরিষদ হিসেবে তারা কাজ করবেন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের খসড়া ও জুলাই ঘোষণার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংস্কারপ্রস্তাব তৈরি করবেন, যা গণভোটে উপস্থাপিত হবে। এতে অনুমোদন পাওয়া গেলে সেই ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হবে। এই ত্রিস্তরীয় প্রক্রিয়ায়—গণপরিষদের বৈধতা, গণভোটের সর্বোচ্চ ম্যান্ডেট এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর—গড়ে উঠবে এক নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামো।
এই কাঠামো নির্মাণে আরেকটি শর্ত হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন।

গণতন্ত্র কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে নয়, বিকশিত হয় স্থানীয় স্তরে সক্রিয়, স্বায়ত্তশাসিত ও জনগণের সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের অগ্রাধিকার দিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে পড়ে। অথচ ২০০৮ সালের মতো একটি উদাহরণই বলে দেয়—তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এই নির্বাচন একদিকে যেমন স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশ ঘটায়, তেমনি নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ দেয়। প্রশাসনিক কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণ, গণতান্ত্রিক অনুশীলন এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরিতে এটি একটি অনিবার্য ধাপ।

সবশেষে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি পুরোনো আওয়ামীতন্ত্র, লুটপাটতন্ত্র ও জুলুমতন্ত্রে ফিরে যাব, নাকি একটি নতুন রাষ্ট্রচুক্তির মাধ্যমে গড়ে তুলবো অংশগ্রহণমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণের মালিকানাধীন একটি রাষ্ট্র?
সময়ের দাবি এখন স্পষ্ট—সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার, অন্তর্বর্তী সরকারের সাহসী পদক্ষেপ এবং সংবিধান সংস্কার সভা, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সমন্বিত আয়োজন। এ সংবিধান হবে জনগণের সর্বস্তরের অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক সংলাপের মাধ্যমে রচিত, যা প্রতিষ্ঠা করবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা।

রাষ্ট্র যদি জনগণের ভাষা না বোঝে, তবে জনগণের রক্তই সংবিধানের ব্যাকরণ হয়ে ওঠে। তাই জাতির হাতে এখন কলম, সামনে সাদা পৃষ্ঠা। এই মুহূর্তেই সময় নতুন অভিলেখ লেখার, যেখানে থাকবে ঐতিহ্যের শিকড় ও মুক্তির উন্মেষ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি নিজের রাষ্ট্র নিজ হাতে পুনর্গঠন করে, তার স্বাধীনতা আর কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না।

মুনতাসির রাসেল

লেখক, সংগঠক।

আর