বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান বহু আলোচিত একটি প্রসঙ্গ। আমি বরাবরই মনে করি—বিএনপির নিজস্ব কোনো রাজনীতি নেই। এর সত্যতা যাচাই করতে চাইলে একটি সহজ পরীক্ষা করা যেতে পারে। যেকোনো বড় বা ছোট বিএনপি নেতাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়—“আপনি কেন বিএনপি করেন?”—তাদের উত্তরে সর্বোচ্চ তিনটি শব্দই বারবার ফিরে আসবে: শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়া এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র। এই তিনটির বাইরে তাদের মুখে কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন বা নীতি শোনা যায় না।
অন্যদিকে একই প্রশ্ন যদি আওয়ামী লীগ বা জামায়াত ইসলামের নেতা–কর্মীদের করা হয়, তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হবেন। এ কারণেই বলা যায়, বিএনপি মূলত নিজস্ব রাজনীতিহীন একটি রাজনৈতিক দল।
তাহলে প্রশ্ন আসে—নিজস্ব রাজনীতি না থাকলে বিএনপি বড় দল হলো কীভাবে এবং আজও টিকে আছে কেন? এর উত্তর নিহিত আছে এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিতে। জিয়া মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী বিভক্ত সমাজকে একসূত্রে বাঁধার জন্য জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করে রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি দেশীয় সংস্কৃতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। এই রাজনৈতিক দর্শনই সমাজের বিভিন্ন স্তরের সৎ ও সাধারণ মানুষকে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিল।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া মূলত তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে টেনে নিয়ে যান। ব্যক্তিগতভাবে খালেদা জিয়ার কিছু মানবীয় গুণাবলী বিএনপিকে জনপ্রিয় করে তোলে। তবে তিনি দলের রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে ব্যর্থ হন। ধীরে ধীরে বিএনপি শহীদ জিয়ার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তি পূজায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্মের কাছে দলটি কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শ বা নীতি তুলে ধরতে পারেনি। ফলে বিএনপির রাজনীতি আজ দাঁড়িয়ে আছে মূলত অতীতের স্মৃতি আর কয়েকজন নেতার নামের ওপর।
তবুও বিএনপি টিকে আছে। টিকে থাকার প্রধান কারণ হলো শহীদ জিয়ার জনপ্রিয়তার উত্তরাধিকার। একসময় সমাজের প্রতিটি স্তরের সৎ ও সাধারণ মানুষ এই দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। সেই প্রজন্মের মানুষদের অনেকেই আজও জীবিত এবং রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হলেও বিএনপির প্রতি তাদের একটি প্রচ্ছন্ন আনুগত্য বজায় রয়েছে। তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাই বিএনপিকে বড় দল হিসেবে ধরে রেখেছে। তবে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে এই প্রজন্ম হারিয়ে গেলে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতায় একটি বড় শূন্যতা তৈরি হবে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তি হিসেবে দেশে একটি অসন্তুষ্ট ভোট ব্যাংক সবসময় বিদ্যমান, যা বিএনপির রাজনৈতিক অস্তিত্বকে ধরে রেখেছে।
কিন্তু একটি দলকে টেকসই ও কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন নিজস্ব দর্শন, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও নীতি। বিএনপির ভাণ্ডারে আজ সেগুলো কার্যত অনুপস্থিত। তাই দলটি দিন দিন অতীতনির্ভর, নেতৃত্বনির্ভর ও সুযোগসন্ধানী শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশে যদি বিএনপি নতুন প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক হতে চায়, তবে অবশ্যই অতীতের নামনির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় বিএনপি হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এর ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
জালিস মাহমুদ
সভাপতি, বাংলাদেশ গঠনতান্ত্রিক আন্দোলন
আর

ভোটের আগে চাঙা রেমিট্যান্স, ১৮ দিনে এলো দুই বিলিয়ন ডলার
জালিস মাহমুদ 




























