বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক বাঁকে, যেখানে আশা আর সন্দেহ পাশাপাশি হাঁটে। ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দেশজুড়ে যে আলোচনার ঢেউ উঠেছে, সেটি নতুন কিছু শুরু করার ইঙ্গিতও দিচ্ছে, আবার পুরনো বিভাজনের ছায়াও বড় করে তুলছে। অভিজ্ঞতা বলে—আমাদের রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি যত সহজে লেখা হয়, তার বাস্তবায়ন তত কঠিন। তবুও এই মুহূর্তে মানুষ প্রশ্ন করছে: এই সনদ কি নতুন সূচনা, না কি আগের মতোই আরেকটি দলীয় রাজনৈতিক কৌশল?
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন (বিআরএসএ)-এর অবস্থান সেই প্রশ্নের মাঝেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দলটি সনদে স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু তাদের নেতারা সন্তুষ্ট নন। সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেছেন, “এই সনদ তিন দলের আগের রূপরেখার চেয়েও দুর্বল।” তবুও তারা সই করেছেন, কারণ একেবারে বাইরে থাকা মানে রাজনৈতিকভাবে অচল হয়ে পড়া। এটাকে বলা যায় এক ধরনের সতর্ক অংশগ্রহণ—বিশ্বাস নেই, তবু আশা ছাড়েননি।
অন্যদিকে, এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি) একেবারেই অনুষ্ঠানে যায়নি। এই অনুপস্থিতি দেখিয়ে দিল, নতুন এই সমঝোতা গড়ার চেষ্টার মধ্যেই ভাঙনের বীজ রয়ে গেছে। বড় দলগুলোর অবস্থা আরও জটিল—বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক এখন এমন পর্যায়ে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। এনসিপির সঙ্গেও তাদের বোঝাপড়া নেই। এমনকি যারা ‘নতুন রাজনীতি’র কথা বলছে—তাদের মধ্যেও তিক্ততা কম নয়।
এদিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, গণফোরাম—এই দলগুলো যেভাবে সনদে যুক্ত হয়েছে, তাতে একটা দ্বন্দ্ব স্পষ্ট: অংশগ্রহণ আছে, কিন্তু আস্থা নেই। যে রাজনীতি মানুষের আশা জাগানোর কথা, সেটি এখন হয়ে উঠছে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের প্রতিযোগিতা।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সত্যিই কি ঐক্যের সুযোগ আছে? নাকি সবাই কেবল নিজ নিজ অবস্থান বাঁচাতেই ব্যস্ত?
জুলাই সনদটি মূলত একটি যৌথ রূপরেখা, যেখানে রাজনৈতিক সংস্কার, গণতন্ত্র পুনর্গঠন, ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু এর ভাষা সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারছে কি? এতে তাদের জীবনের কী বদল আসবে? একজন কৃষক বা শ্রমিকের কাছে রাজনীতি মানে খুব সরল—দাম, কাজ, ন্যায়বিচার। কিন্তু সনদের পাতায় এসব বাস্তব প্রশ্নের উত্তর মিলছে? তাই এর বিশ্বাসযোগ্যতা এখনই পরীক্ষার সম্মুখীন। কৃষকের রাষ্ট্র সংস্কারে কৃষকের মত গুরুত্ব পেল? শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে সক্ষম এই সনদ?
এই সনদ কৃষক, শ্রমিক, গরীব-দুঃখী, খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রকে দাড় করাতে পারবে? হাজারো প্রশ্ন এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দাড়িয়ে দেশ এবং জনগণ।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তারা সই করেছে কিন্তু সমালোচনাও করেছে প্রকাশ্যে। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন অন্তত বলেছে তারা সন্তুষ্ট নয়। এই অসন্তুষ্টিই এখন সবচেয়ে দরকারি শক্তি—কারণ পরিবর্তন শুরু হয় প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে।
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি—সব দলই এখন ভেতরে ভেতরে বিভক্ত। একসময়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন ঠান্ডা যুদ্ধের মতো। বড় দলগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় হারাচ্ছে, আর ছোট দলগুলো মরিয়া হয়ে জায়গা খুঁজছে। এ অবস্থায় কারও কাছেই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু সবাই ভাবছে নিজেরাই কেন্দ্র। তাই রাজনীতির ভাষা যতই বদলানো হোক, চরিত্র কিন্তু একই—অবিশ্বাস আর আত্মকেন্দ্রিকতা।
এই পরিস্থিতিতে সমঝোতা দুর্বলতা নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল। কারণ রাজনীতি কোনো যুদ্ধ নয়; এটি আসলে কথাবার্তার শিল্প। যদি কথা না থাকে, তাহলে সংঘাতই বাকি থাকে। জুলাই সনদের সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারত একটি যৌথ সংলাপের সংস্কৃতি। কিন্তু তার বদলে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, কে কার চেয়ে বেশি ‘বিপ্লবী’ তা প্রমাণের প্রতিযোগিতা।
এখন প্রয়োজন শান্ত অথচ দৃঢ় রাজনীতি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন যদি সত্যিই বিকল্প রাজনীতি গড়তে চায়, তবে তাদের এখনই কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, তাদের জোট গণতন্ত্র মঞ্চকে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট হিসেবে সামনে আসতে হবে, যেখানে বিরোধ নয়, বোঝাপড়াই অগ্রাধিকার পাবে। তারপরও বড় দলগুলোর ভেতরে যেন এই অনুভূতি জাগে যে এই জোট ক্ষমতা পেতে সক্ষম। তাহলে তাদের তোলা আলাপগুলো আরও গুরুত্ব পাবে।
দ্বিতীয়ত, সনদ বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের করণীয় প্রকাশ করতে হবে—কীভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া বদলাবে, প্রশাসন কীভাবে দায়বদ্ধ হবে, এবং নাগরিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে হবে।
তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতে হবে। রাজনীতি এখন মিডিয়ার খোপে বন্দি, মাঠের মানুষের হৃদয়ে নয়।
বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতির তর্কে ক্লান্ত। তারা এখন ফল চায়, রূপক নয়। তারা চায় এমন রাজনীতি, যা শুধু ঢাকায় হয় না, বরং তাদের জীবনেও ছোঁয়া দেয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলো যদি এখনো নিজেদের ভেদাভেদে ডুবে থাকে, তাহলে জনগণই একদিন তাদের পাশে না থাকার সিদ্ধান্ত নেবে।
এই সময়ের রাজনীতিতে সবচেয়ে জরুরি জিনিস হলো বিশ্বাসের পুনর্গঠন। দলগুলোর মধ্যে নয়, জনগণের সঙ্গে। জুলাই সনদকে যদি সত্যিকার অর্থে জীবিত রাখতে হয়, তাহলে তা কাগজের বাইরে যেতে হবে—মাঠে, গ্রামে, কর্মস্থলে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন সেই পথে প্রথম পা রেখেছে, কিন্তু সেটি দীর্ঘ পথ।
রাজনীতি মানে প্রতিশ্রুতি নয়, দায়বদ্ধতা। আজ যারা সনদে নাম লিখেছেন, তাদের সামনে প্রশ্ন একটাই—তারা কি এই দায়বদ্ধতা নিতে প্রস্তুত? তারা কি সনদে লেখা কথাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন, নাকি এটিও এক সময় ভুলে যাওয়া কাগজ হয়ে যাবে?
সবশেষে, সিদ্ধান্ত জনগণের। দলগুলো যতই একে অপরের দিকে আঙুল তুলুক, শেষ কথাটা মাঠের মানুষই বলবে। তারা ঠিক করবে, এই সনদ টিকে থাকবে কি না। তারা ঠিক করবে, রাজনীতি আবার মানুষমুখী হবে কি না।
এখন সময় সোজাসাপ্টা প্রশ্নের:
এই সনদে জনগণের জায়গা কোথায়?
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি—তারা কি এখনো একসঙ্গে বসতে পারবে?
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর মতো দলগুলো কি ভয়ের বাইরে গিয়ে বিকল্প রাজনীতির নেতৃত্ব নেবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি স্পষ্ট না হয়, তবে রাজনীতি আবারও সেই পুরনো চক্রে ঘুরবে।
জুলাই সনদ হয়তো নিখুঁত নয়, কিন্তু এটি একটা জানালা খুলেছে। এখন সেই জানালা দিয়ে আলো আসবে, না ধুলো ঢুকবে—তা ঠিক করবে রাজনীতির পরবর্তী আচরণ।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক পরীক্ষার মুখে—বিভাজনের মধ্যেও কি তারা ঐক্যের রাস্তা খুঁজে পাবে?
এই প্রশ্নের জবাব দেবে সময় নয়, দেবে জনগণই।
লেখকঃ মামুনুর রশীদ।
সহ-মিডিয়া সম্পাদক,
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
আর

দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না
ডেসটিনি ডেস্ক 



























