ঢাকা , রবিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
Logo শহিদুল ইসলাম সভাপতি ও খুরশীদ আলম সাধারণ সম্পাদক পুনঃনির্বাচিত Logo ২০২৬ বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা করল ফিফা Logo দেশীয় চিনির মজুত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি বন্ধ: শিল্প উপদেষ্টা Logo খালেদা জিয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আসার অনুমতি চাইল মঙ্গলবার Logo গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এখনও অর্জিত হয়নি: কাতারের প্রধানমন্ত্রী Logo পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ৪০ হাজার মানুষের জন্য রান্না হচ্ছে বিরিয়ানি Logo আগামী নির্বাচনী ইশতেহার হবে মানুষের মুক্তির সনদ Logo পীরগঞ্জের শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা Logo লালমনিরহাট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিলের দাবিতে হরিজন সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ Logo ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ রাজৈরের যুবক ছামির শেখ, পরিবারে মাতম

মা! সে যে স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০১:৩৭:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৬৪ বার পড়া হয়েছে

> “এইডা আমার মা! দশ দিন ধইরা জ্বরে ভোগতাছে… নিজেই খাইতে পাইনা, কামাই রুজি নাই, অসুধ কিনমু কেমনে!”
> রাগ আর অশ্রুঝরা অভিমানী কণ্ঠে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে সে বলছে: “এইডার মরণও হয় না! আল্লায় কি এইডারে দেহে না, এইডারে নেয়না কেন!”
>কথাগুলো আজও আমার কানে ভাসে। সেই করুণ দৃশ্য, সেই রহস্যময় আবেগ— প্রায় দুই যুগ পরেও আমার হৃদয়ে ঘুরে বেড়ায় এক অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি হয়ে।

কৈশোরের পথে এক বাউন্ডুলে শিল্পী:
সময়টা ছিল আমার কৈশোরের, যখন মন ছিল বাউন্ডুলের মতো বিচিত্রময়। কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হওয়ার নেশায় বিভোর হয়ে আমি তখন সুদূর সিলেট শহরে একটি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। শিল্পকলার প্রতি এমন টান যে, কোনো বাধা আমাকে আটকে রাখতে পারেনি।

একদিন একটি কাজের সূত্রে সিলেট থেকে কুলাউড়া উপজেলা যাওয়ার দরকার পড়ল। রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছি আমরা চার-পাঁচজন আর্টিস্ট। ঠিক তখনই পেছন থেকে হাত পাতল প্রায় পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে। ছেঁড়া হাফপ্যান্ট পরা, গায়ে কোনো জামা নেই। মায়াবী, শ্যামলা কালো চেহারায় অনাহার আর পিপাসার স্পষ্ট ছাপ। তোতলানো অস্ফুট স্বরে সে বলল, “এএ একতা তেকা (একটা টাকা) দেন।”

আমাদের দলপ্রধান ধমক দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেন। শিশুটি এরপর অনেকের কাছেই হাত পাতল, কিন্তু বেশিরভাগই তাকে ফিরিয়ে দিল।

এয়াছিন, এক অভুক্ত শিশু: 
শিশুটির কথা বলার ধরণ ও করুণ আকুতি দেখে আমার ভেতরে এক গভীর মায়া হলো। পকেটে ভাংতি না থাকায় একটি ম্যাগাজিন পেপার কিনে ভাংতি করলাম। শিশুটিকে ডেকে ক’টা টাকা হাতে দিতেই সে যেন খুশিতে আত্মহারা।
আমি তার পরিচয় জানতে চাইলাম। শিশুটির অস্পষ্ট উত্তর: তার নাম “এএএয়া এছিন” (এয়াছিন)। বাবার কথা জিজ্ঞেস করে মনে হলো, ‘বাবা’ নামক স্বর্গীয় শব্দটি সম্পর্কে তার ন্যূনতম ধারণাই নেই। টাকা দিয়ে কী করবে? তার সহজ উত্তর: “ভাত খাবো, আম্মু আর আমি। নানুর ‘অচুক’ (অসুস্থ)।”

ভাঙা-ভাঙা কোমল কণ্ঠে বলা কথাগুলো হৃদয়ে নাড়া দিল। কিন্তু এরই মধ্যে দলপ্রধানের উচ্চস্বর ধমক: “এই ছেলে, এদিকে এসো!” শিশুটির সাথে কথা বলায় তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছেন। তাঁর রূঢ় ব্যবহারে কষ্ট পেলেও প্রতিবাদ করার সুযোগ পেলাম না-ট্রেন এসে গেল।

গাড়িতে বসে দলপ্রধানের ব্যাখ্যা আরও রহস্যময় মনে হলো: “আরে বোকা ছেলে, এমন ধরনের ছেলেদেরকে কেউ এভাবে টাকা দেয়? এরা হলো জারজ সন্তান। এদের কোনো বাবার পরিচয় নেই।” সেই বয়সে ‘জারজ সন্তান’ কাকে বলে তা জানা ছিল না। রহস্য আরও দানা বাঁধল। কিন্তু কুলাউড়া স্টেশনে ট্রেন থেমে যাওয়ায় আর কিছু জিজ্ঞেস করা হলো না। তবুও, শিশুটির প্রতি মায়া আমার মন থেকে সরেনি।

অভিশাপ, গালি আর মাতৃত্বের ভালোবাসা: 
পরদিন আরেকটি কাজের জন্য কুলাউড়া থেকে এসে রেল স্টেশনে নামতেই সেই শিশুটির কথা মনে পড়ল। হঠাৎ চোখ পড়ল রেললাইনের পাশে ময়লা-আবর্জনার মধ্যে বসে শিশুটি কাঁদছে। আমি এগোতেই নারী কণ্ঠে “এয়াছিন” নাম ধরে ডাক এল।

দেখলাম সালোয়ার-কামিজ পরা, যৌবনের শেষ বয়সের এক নারী। পুরাতন পোশাক হলেও চেহারায় এক নজরকাড়া ভাব, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, কপালে লাল টিপ। আর এই নারীই যে শিশুটির মা, তা বুঝতে দেরি হলো না।

পাশে দৃষ্টি পড়ল সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা মহিলার দিকে। নোংরা ময়লা-আবর্জনার মধ্যে অর্ধনগ্ন, অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। হাত-পা খুব একটা নড়াচড়া করছেন না, দেখেই বোঝা যায় গুরুতর অসুস্থ। বৃদ্ধার চামড়া কালচে পোড়া, শরীরের হাড়গুলো যেন মাকড়সার জালের মতো পেঁচানো। মনে হলো, মল লেগে আছে জীর্ণ কাপড়ে, বেরিয়ে আসছে দুর্গন্ধ।

ক্ষুধার্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় শিশুটির মা প্রথমে আমাকে ধমকে তাড়িয়ে দিলেন। কাছেই দোকান থেকে পাউরুটি কিনে তার হাতে দিতেই তিনি যেন কিছুটা স্বাভাবিক হলেন। প্যাকেট ছিঁড়ে এক টুকরো দিলেন এয়াছিনের হাতে, আরেক টুকরো অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের মুখে তুলে দিয়ে বললেন, “এই নে খা।”

তখনই তিনি করুণ স্বরে সেই কথাগুলো বললেন, যা আজো কানে বাজে:
> “এইডা আমার মা! দশ দিন ধইরা জ্বরে ভোগতাছে… নিজেই খাইতে পাইনা, কামাই রুজি নাই, অসুধ কিনমু কেমনে!”
>
চোখের জলে তার মুখের মেকআপ ধুয়ে যাচ্ছিল। সেই চরম দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের মধ্যেও রাগ ও অভিমান মিশিয়ে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে তিনি বললেন: “এইডার মরণও অয় না, আল্লায় এইডারে দেহে না, আল্লায় এইডারে নেয় না কেন!”
থমকে দাঁড়িয়েছিলাম! এই গালি আর অভিশাপের মধ্যেও যে মায়ের প্রতি কী গভীর দরদ ও ভালোবাসা লুকিয়ে আছে! এত অভাব-অনটন, অনাহারেও তিনি তাঁর মাকে আড়াল করতে পারেননি।

মা-ই সন্তানের স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ:
তখন হয়তো ‘জারজ সন্তান’ কাকে বলে বুঝতাম না। হয়তো শিশুটির মায়েরও কোনো বাবার পরিচয় ছিল না, তিনিও মায়ের আদলেই বড় হয়েছেন। কিন্তু এই দৃশ্য প্রমাণ করে— মা মায়ই, আর সন্তান সন্তানই, সে যে শ্রেণীয়ই হোক না কেন।
এই পৃথিবীতে মা-ই হচ্ছে সন্তানের স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ। চরম দুর্দশার মধ্যে থেকেও এই নারী তার অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী মাকে ফেলে যাননি। তার ভাষা হয়তো কঠোর ছিল, কিন্তু তার অশ্রুভরা চোখ আর অভিমানী গালি ছিল আসলে নিয়তির প্রতি তার তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই ক্ষোভের মূলে ছিল মাকে বাঁচানোর তীব্র আকুতি।

সেই করুণ ও রহস্যময় দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি আজও হৃদয় সাগরে ভেসে ওঠে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়: সামাজিক তকমা বা পরিচয় যাই হোক না কেন, মাতৃত্বের বন্ধন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আশ্রয়।

 

মা! সে যে স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ
লেখক: শামছুজ্জামান বাবুল

এএস/

শহিদুল ইসলাম সভাপতি ও খুরশীদ আলম সাধারণ সম্পাদক পুনঃনির্বাচিত

মা! সে যে স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ

আপডেট সময় ০১:৩৭:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫

> “এইডা আমার মা! দশ দিন ধইরা জ্বরে ভোগতাছে… নিজেই খাইতে পাইনা, কামাই রুজি নাই, অসুধ কিনমু কেমনে!”
> রাগ আর অশ্রুঝরা অভিমানী কণ্ঠে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে সে বলছে: “এইডার মরণও হয় না! আল্লায় কি এইডারে দেহে না, এইডারে নেয়না কেন!”
>কথাগুলো আজও আমার কানে ভাসে। সেই করুণ দৃশ্য, সেই রহস্যময় আবেগ— প্রায় দুই যুগ পরেও আমার হৃদয়ে ঘুরে বেড়ায় এক অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি হয়ে।

কৈশোরের পথে এক বাউন্ডুলে শিল্পী:
সময়টা ছিল আমার কৈশোরের, যখন মন ছিল বাউন্ডুলের মতো বিচিত্রময়। কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হওয়ার নেশায় বিভোর হয়ে আমি তখন সুদূর সিলেট শহরে একটি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। শিল্পকলার প্রতি এমন টান যে, কোনো বাধা আমাকে আটকে রাখতে পারেনি।

একদিন একটি কাজের সূত্রে সিলেট থেকে কুলাউড়া উপজেলা যাওয়ার দরকার পড়ল। রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছি আমরা চার-পাঁচজন আর্টিস্ট। ঠিক তখনই পেছন থেকে হাত পাতল প্রায় পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে। ছেঁড়া হাফপ্যান্ট পরা, গায়ে কোনো জামা নেই। মায়াবী, শ্যামলা কালো চেহারায় অনাহার আর পিপাসার স্পষ্ট ছাপ। তোতলানো অস্ফুট স্বরে সে বলল, “এএ একতা তেকা (একটা টাকা) দেন।”

আমাদের দলপ্রধান ধমক দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেন। শিশুটি এরপর অনেকের কাছেই হাত পাতল, কিন্তু বেশিরভাগই তাকে ফিরিয়ে দিল।

এয়াছিন, এক অভুক্ত শিশু: 
শিশুটির কথা বলার ধরণ ও করুণ আকুতি দেখে আমার ভেতরে এক গভীর মায়া হলো। পকেটে ভাংতি না থাকায় একটি ম্যাগাজিন পেপার কিনে ভাংতি করলাম। শিশুটিকে ডেকে ক’টা টাকা হাতে দিতেই সে যেন খুশিতে আত্মহারা।
আমি তার পরিচয় জানতে চাইলাম। শিশুটির অস্পষ্ট উত্তর: তার নাম “এএএয়া এছিন” (এয়াছিন)। বাবার কথা জিজ্ঞেস করে মনে হলো, ‘বাবা’ নামক স্বর্গীয় শব্দটি সম্পর্কে তার ন্যূনতম ধারণাই নেই। টাকা দিয়ে কী করবে? তার সহজ উত্তর: “ভাত খাবো, আম্মু আর আমি। নানুর ‘অচুক’ (অসুস্থ)।”

ভাঙা-ভাঙা কোমল কণ্ঠে বলা কথাগুলো হৃদয়ে নাড়া দিল। কিন্তু এরই মধ্যে দলপ্রধানের উচ্চস্বর ধমক: “এই ছেলে, এদিকে এসো!” শিশুটির সাথে কথা বলায় তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছেন। তাঁর রূঢ় ব্যবহারে কষ্ট পেলেও প্রতিবাদ করার সুযোগ পেলাম না-ট্রেন এসে গেল।

গাড়িতে বসে দলপ্রধানের ব্যাখ্যা আরও রহস্যময় মনে হলো: “আরে বোকা ছেলে, এমন ধরনের ছেলেদেরকে কেউ এভাবে টাকা দেয়? এরা হলো জারজ সন্তান। এদের কোনো বাবার পরিচয় নেই।” সেই বয়সে ‘জারজ সন্তান’ কাকে বলে তা জানা ছিল না। রহস্য আরও দানা বাঁধল। কিন্তু কুলাউড়া স্টেশনে ট্রেন থেমে যাওয়ায় আর কিছু জিজ্ঞেস করা হলো না। তবুও, শিশুটির প্রতি মায়া আমার মন থেকে সরেনি।

অভিশাপ, গালি আর মাতৃত্বের ভালোবাসা: 
পরদিন আরেকটি কাজের জন্য কুলাউড়া থেকে এসে রেল স্টেশনে নামতেই সেই শিশুটির কথা মনে পড়ল। হঠাৎ চোখ পড়ল রেললাইনের পাশে ময়লা-আবর্জনার মধ্যে বসে শিশুটি কাঁদছে। আমি এগোতেই নারী কণ্ঠে “এয়াছিন” নাম ধরে ডাক এল।

দেখলাম সালোয়ার-কামিজ পরা, যৌবনের শেষ বয়সের এক নারী। পুরাতন পোশাক হলেও চেহারায় এক নজরকাড়া ভাব, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, কপালে লাল টিপ। আর এই নারীই যে শিশুটির মা, তা বুঝতে দেরি হলো না।

পাশে দৃষ্টি পড়ল সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা মহিলার দিকে। নোংরা ময়লা-আবর্জনার মধ্যে অর্ধনগ্ন, অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। হাত-পা খুব একটা নড়াচড়া করছেন না, দেখেই বোঝা যায় গুরুতর অসুস্থ। বৃদ্ধার চামড়া কালচে পোড়া, শরীরের হাড়গুলো যেন মাকড়সার জালের মতো পেঁচানো। মনে হলো, মল লেগে আছে জীর্ণ কাপড়ে, বেরিয়ে আসছে দুর্গন্ধ।

ক্ষুধার্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় শিশুটির মা প্রথমে আমাকে ধমকে তাড়িয়ে দিলেন। কাছেই দোকান থেকে পাউরুটি কিনে তার হাতে দিতেই তিনি যেন কিছুটা স্বাভাবিক হলেন। প্যাকেট ছিঁড়ে এক টুকরো দিলেন এয়াছিনের হাতে, আরেক টুকরো অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের মুখে তুলে দিয়ে বললেন, “এই নে খা।”

তখনই তিনি করুণ স্বরে সেই কথাগুলো বললেন, যা আজো কানে বাজে:
> “এইডা আমার মা! দশ দিন ধইরা জ্বরে ভোগতাছে… নিজেই খাইতে পাইনা, কামাই রুজি নাই, অসুধ কিনমু কেমনে!”
>
চোখের জলে তার মুখের মেকআপ ধুয়ে যাচ্ছিল। সেই চরম দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের মধ্যেও রাগ ও অভিমান মিশিয়ে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে তিনি বললেন: “এইডার মরণও অয় না, আল্লায় এইডারে দেহে না, আল্লায় এইডারে নেয় না কেন!”
থমকে দাঁড়িয়েছিলাম! এই গালি আর অভিশাপের মধ্যেও যে মায়ের প্রতি কী গভীর দরদ ও ভালোবাসা লুকিয়ে আছে! এত অভাব-অনটন, অনাহারেও তিনি তাঁর মাকে আড়াল করতে পারেননি।

মা-ই সন্তানের স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ:
তখন হয়তো ‘জারজ সন্তান’ কাকে বলে বুঝতাম না। হয়তো শিশুটির মায়েরও কোনো বাবার পরিচয় ছিল না, তিনিও মায়ের আদলেই বড় হয়েছেন। কিন্তু এই দৃশ্য প্রমাণ করে— মা মায়ই, আর সন্তান সন্তানই, সে যে শ্রেণীয়ই হোক না কেন।
এই পৃথিবীতে মা-ই হচ্ছে সন্তানের স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ। চরম দুর্দশার মধ্যে থেকেও এই নারী তার অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী মাকে ফেলে যাননি। তার ভাষা হয়তো কঠোর ছিল, কিন্তু তার অশ্রুভরা চোখ আর অভিমানী গালি ছিল আসলে নিয়তির প্রতি তার তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই ক্ষোভের মূলে ছিল মাকে বাঁচানোর তীব্র আকুতি।

সেই করুণ ও রহস্যময় দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি আজও হৃদয় সাগরে ভেসে ওঠে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়: সামাজিক তকমা বা পরিচয় যাই হোক না কেন, মাতৃত্বের বন্ধন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আশ্রয়।

 

মা! সে যে স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ
লেখক: শামছুজ্জামান বাবুল

এএস/