ঢাকা , মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

৪০০ টাকা আয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু, এখন মাসে আয় ৬ লাখ

বাবাকে হারান ২০১৭ সালে। সে সময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন। ২০১৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই

অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০১৭ সাল থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করে এখন তিনি স্বাবলম্বী। বর্তমানে কাজ করেছেন বিদেশি কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে। নিজেও খুলেছেন একটি প্রতিষ্ঠান। মাসে তাঁর আয় ১০-১২ হাজার ডলার। বাংলাদেশি টাকায় ১০-১২ লাখ টাকা। অফিসের স্টাফদের বেতনসহ খরচ বাদে মাসে ৫-৬ লাখ টাকা আয় করেন।

সফল এ ফ্রিল্যান্সারের নাম মো. শাহীন (২৭)। মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে বলড়া ইউনিয়নের পিপুলিয়া গ্রামে তাঁর বাড়ি। ২০১৯ সালে আশা আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। এখন মা, স্ত্রী আর ছয় মাস বয়সী ছেলে সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার।

উপজেলার বলড়া ইউনিয়নের বলড়া মুন্নু আদর্শ উচ্চ বিদ্যানিকেতন থেকে ২০১৩ সালে এসএসসি এবং আদর্শ মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এইচএসসি পাশ করেন। ২০২২ সালে খাবাশপুর থেকে স্নাতক শেষ করেন। বর্তমানে মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর করছেন তিনি।

ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে মো. শাহীন  জানান, ২০১৬ সালে মানিকগঞ্জ শহরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্টের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং শেখানোর একটি বিজ্ঞাপনের লিফলেট দেখে আগ্রহী হন। তারপর লিফলেটে দেওয়া ওয়েবসাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে অনলাইন এ পরীক্ষা দেন।

দুদিন পর প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হন। ৫ হাজার রেজিস্ট্রেশন করা শিক্ষার্থীদের থেকে ৪০ জনকে চূড়ান্তভাবে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচন করা হলে হরিরামপুর উপজেলা থেকে তিনি একাই নির্বাচিত হন।

পরে ২০১৭ সালে প্রথম কাজে ৫ ডলার আয় হয় তাঁর। যা সে সময় বাংলাদেশি টাকা ৪০০। ছয় মাসের মধ্যে আয় বাড়তে থাকে। ২০১৯ সাল থেকেই প্রতি মাসে ৩-৪ লাখ টাকা আয় হয় তাঁর। স্ত্রী আশা আক্তারও ফ্রিল্যান্সিং করতেন।

এদিকে ফ্রিল্যান্সিং পেশায় সম্ভাবনা দেখে, ‘বেকারত্বকে না বলি, ঘরে বসে আয় করি’—এ স্লোগানে শাহীন উপজেলার বলড়া বাজারে ২০১৭ সালে ২৩ অক্টোবর এডভান্স ট্রেনিং সেন্টার নামের একটি ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে দেশের গন্ডি পেরিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে কাজ করছেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষানার্থীর সংখ্যা ৩০ জন।

এছাড়া নিজ বাড়ির দোতলায় করা অফিসে আটজন স্টাফ কাজ করেন। আর বলড়া বাজারের ট্রেনিং সেন্টারে চারজন ট্রেইনার রয়েছে।

এই পেশায় আগ্রহের বিষয়ে শাহিন জানান, মূলত এই কাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা রয়েছে। তাই কাজের সময় নিজেই নির্ধারণ করে নেওয়া য়ায়। যেখানে ইচ্ছা সেখান থেকেই কাজ করা এবং আপডেটেট থাকা যায়।

  শাহীন বলেন, ‘অনলাইনেও যে আয় করে স্বাবলম্বী হওয়া যায় তা বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ কম জানে। আমার প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় দেখে গ্রামের লোকেরা মনে করত যে, আমি কোনো অবৈধ উপায়ে উপার্জন করছি কিনা। ফ্রিল্যান্সিং বর্তমান সময়ে একটি সম্মানজনক পেশা হয়ে উঠছে, সে বিষয়ে অনেকের ধারণা নেই। ফ্রিল্যান্সিং অথবা আউটসোর্সিং সম্পর্কে সবাইকে ধারণা দিতে হবে।’

কর্মহীনদের উদ্দেশ্যে শাহীন বলেন, ‘বর্তমানে চাকরি পাওয়া খুবই কঠিন। অনলাইনে প্রচুর কাজ রয়েছে। এখান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। তাই চাকরির পেছনে না ঘুরে, সঠিক পথে পরিশ্রম করে কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়া যায়। আমি চাই এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং শিখুক।’

শাহীনের স্ত্রী আশা আক্তার জানান, ‘আমি নিজেও ফ্রিল্যান্সিং করে ২৫ লাখ টাকার মতো আয় করেছি। এখন সন্তানকে সময় দিচ্ছি।’

প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনার মামুন হোসেন বলেন, ‘চাঁদপুর থেকে হরিরামপুরে শাহিন ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে চার মাস হলো কাজ করি। প্রতিমাসে ১ লাখ টাকা বেতনে কাজ করছি। এর আগে ২০১৯ সাল থেকে বাসায় বসে উনার সঙ্গে চুক্তিভিত্তক কাজ করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহরিয়ার রহমান বলেন, ‘সফল ফ্রিল্যান্সার শাহিন মিয়ার কথা জেনেছি। তিনি আমাদের উপজেলার জন্য সম্পদ। আশা করি, বেকারত্ব সমস্যা দূর করতে তিনি আরও ভূমিকা রাখতে পারবেন।’

৪০০ টাকা আয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু, এখন মাসে আয় ৬ লাখ

আপডেট সময় ০২:১২:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৩

বাবাকে হারান ২০১৭ সালে। সে সময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন। ২০১৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই

অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০১৭ সাল থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করে এখন তিনি স্বাবলম্বী। বর্তমানে কাজ করেছেন বিদেশি কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে। নিজেও খুলেছেন একটি প্রতিষ্ঠান। মাসে তাঁর আয় ১০-১২ হাজার ডলার। বাংলাদেশি টাকায় ১০-১২ লাখ টাকা। অফিসের স্টাফদের বেতনসহ খরচ বাদে মাসে ৫-৬ লাখ টাকা আয় করেন।

সফল এ ফ্রিল্যান্সারের নাম মো. শাহীন (২৭)। মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে বলড়া ইউনিয়নের পিপুলিয়া গ্রামে তাঁর বাড়ি। ২০১৯ সালে আশা আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। এখন মা, স্ত্রী আর ছয় মাস বয়সী ছেলে সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার।

উপজেলার বলড়া ইউনিয়নের বলড়া মুন্নু আদর্শ উচ্চ বিদ্যানিকেতন থেকে ২০১৩ সালে এসএসসি এবং আদর্শ মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এইচএসসি পাশ করেন। ২০২২ সালে খাবাশপুর থেকে স্নাতক শেষ করেন। বর্তমানে মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর করছেন তিনি।

ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে মো. শাহীন  জানান, ২০১৬ সালে মানিকগঞ্জ শহরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্টের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং শেখানোর একটি বিজ্ঞাপনের লিফলেট দেখে আগ্রহী হন। তারপর লিফলেটে দেওয়া ওয়েবসাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে অনলাইন এ পরীক্ষা দেন।

দুদিন পর প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হন। ৫ হাজার রেজিস্ট্রেশন করা শিক্ষার্থীদের থেকে ৪০ জনকে চূড়ান্তভাবে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচন করা হলে হরিরামপুর উপজেলা থেকে তিনি একাই নির্বাচিত হন।

পরে ২০১৭ সালে প্রথম কাজে ৫ ডলার আয় হয় তাঁর। যা সে সময় বাংলাদেশি টাকা ৪০০। ছয় মাসের মধ্যে আয় বাড়তে থাকে। ২০১৯ সাল থেকেই প্রতি মাসে ৩-৪ লাখ টাকা আয় হয় তাঁর। স্ত্রী আশা আক্তারও ফ্রিল্যান্সিং করতেন।

এদিকে ফ্রিল্যান্সিং পেশায় সম্ভাবনা দেখে, ‘বেকারত্বকে না বলি, ঘরে বসে আয় করি’—এ স্লোগানে শাহীন উপজেলার বলড়া বাজারে ২০১৭ সালে ২৩ অক্টোবর এডভান্স ট্রেনিং সেন্টার নামের একটি ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে দেশের গন্ডি পেরিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে কাজ করছেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষানার্থীর সংখ্যা ৩০ জন।

এছাড়া নিজ বাড়ির দোতলায় করা অফিসে আটজন স্টাফ কাজ করেন। আর বলড়া বাজারের ট্রেনিং সেন্টারে চারজন ট্রেইনার রয়েছে।

এই পেশায় আগ্রহের বিষয়ে শাহিন জানান, মূলত এই কাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা রয়েছে। তাই কাজের সময় নিজেই নির্ধারণ করে নেওয়া য়ায়। যেখানে ইচ্ছা সেখান থেকেই কাজ করা এবং আপডেটেট থাকা যায়।

  শাহীন বলেন, ‘অনলাইনেও যে আয় করে স্বাবলম্বী হওয়া যায় তা বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ কম জানে। আমার প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় দেখে গ্রামের লোকেরা মনে করত যে, আমি কোনো অবৈধ উপায়ে উপার্জন করছি কিনা। ফ্রিল্যান্সিং বর্তমান সময়ে একটি সম্মানজনক পেশা হয়ে উঠছে, সে বিষয়ে অনেকের ধারণা নেই। ফ্রিল্যান্সিং অথবা আউটসোর্সিং সম্পর্কে সবাইকে ধারণা দিতে হবে।’

কর্মহীনদের উদ্দেশ্যে শাহীন বলেন, ‘বর্তমানে চাকরি পাওয়া খুবই কঠিন। অনলাইনে প্রচুর কাজ রয়েছে। এখান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। তাই চাকরির পেছনে না ঘুরে, সঠিক পথে পরিশ্রম করে কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়া যায়। আমি চাই এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং শিখুক।’

শাহীনের স্ত্রী আশা আক্তার জানান, ‘আমি নিজেও ফ্রিল্যান্সিং করে ২৫ লাখ টাকার মতো আয় করেছি। এখন সন্তানকে সময় দিচ্ছি।’

প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনার মামুন হোসেন বলেন, ‘চাঁদপুর থেকে হরিরামপুরে শাহিন ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে চার মাস হলো কাজ করি। প্রতিমাসে ১ লাখ টাকা বেতনে কাজ করছি। এর আগে ২০১৯ সাল থেকে বাসায় বসে উনার সঙ্গে চুক্তিভিত্তক কাজ করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহরিয়ার রহমান বলেন, ‘সফল ফ্রিল্যান্সার শাহিন মিয়ার কথা জেনেছি। তিনি আমাদের উপজেলার জন্য সম্পদ। আশা করি, বেকারত্ব সমস্যা দূর করতে তিনি আরও ভূমিকা রাখতে পারবেন।’